সিভিক ন্যাশনালিজম: কেন এটিই আগামীর পথ?



বর্তমান পৃথিবী এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের হাত ধরে ডানপন্থী পপুলিজমের উত্থান, অন্যদিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর অবিশ্বাস্য গতি আমাদের চেনা উৎপাদন ব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এই নিউ রিয়ালিটি বা নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ যদি তার অভ্যন্তরীণ আকিদাগত বিভাজন, ধর্মীয় উগ্রপন্থা এবং পরিচয়বাদী রাজনীতির গোলকধাঁধায় আটকে থাকে, তবে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র রক্ষাকবচ হলো— সিভিক ন্যাশনালিজম বা নাগরিক জাতীয়তাবাদ।

নাগরিক জাতীয়তাবাদ কী এবং কেন এটি অপরিহার্য?

নাগরিক জাতীয়তাবাদ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক চুক্তি, যেখানে রাষ্ট্রের ভিত্তি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, ভাষা বা নৃগোষ্ঠী নয়; বরং ভিত্তি হলো একটি সংবিধান, আইনি সমতা এবং অভিন্ন নাগরিক অধিকার। বিখ্যাত দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান বলেছিলেন, "জাতীয়তাবাদ হলো একটি প্রতিদিনের গণভোট।" অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবে নয়, বরং রাষ্ট্রকে ভালোবেসে এবং তার নিয়মকে মেনে নিয়ে প্রতিদিন নাগরিক হিসেবে নিজেকে বেছে নেয়।

বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশী’ কিংবা ‘ধর্মীয়’ বনাম ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ পরিচয়ের দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই বিভাজন সমাজকে এতটাই বিষিয়ে তুলেছে যে, আমরা একজন নাগরিককে ‘সহনাগরিক’ হিসেবে দেখার আগে তাকে ‘জাহান্নামী’, ‘অচ্ছুত’ বা ‘দেশপ্রেমহীন’ হিসেবে ট্যাগ করছি। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো আজ সফল কারণ তারা একটি দীর্ঘ ‘মানসিক রেনেসাঁ’র মধ্য দিয়ে গিয়ে গির্জাভিত্তিক শাসনের কবর দিয়েছে এবং মানুষকে কেবল ‘নাগরিক’ হিসেবে দেখতে শিখেছে। আমাদের দেশেও সেই মানসিক রেনেসাঁ এবং সিভিক ন্যাশনালিজমের প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

'হার্ডকোর বাংলাদেশী' নির্মাণ: একটি ১০ স্তম্ভের রূপরেখা

নাগরিক জাতীয়তাবাদকে কেবল সংবিধানে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি প্রায়োগিক রোডম্যাপে রূপান্তর করতে হবে। আমার প্রস্তাবিত ১০টি স্তম্ভ মূলত একটি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট, যা বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

১. সংহতির একক ভিত্তি: রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নাগরিকের অন্য কোনো পরিচয় মুখ্য হবে না। প্রতিটি নাগরিক নিজেকে একজন 'হার্ডকোর বাংলাদেশী' হিসেবে গড়ে তুলবে, যেখানে প্রধান পরিচয় হবে তার নাগরিকত্ব, তার ধর্ম বা গোষ্ঠী নয়।

২. পারিবারিক আইনের আধুনিকায়ন: ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও রাষ্ট্রকে অভিভাবক হতে হবে। ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘রাষ্ট্রীয় পারিবারিক বিধান’ বা সিভিল কোড থাকবে, যা নাগরিকদের একটি আধুনিক ও জটিলতামুক্ত জীবনযাপনের বিকল্প পথ দেবে।

৩. মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব ও টেকনোক্রেসি: সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন বিশেষজ্ঞ বা টেকনোক্র্যাটরা। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকে আলাদা করে কেবল আইনজীবী, সমাজবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের আইন সভায় প্রাধান্য দিতে হবে, যাতে নীতি নির্ধারণে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ বা কায়েমি স্বার্থ বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

৪. শিক্ষার শর্তে ন্যায়বিচার: আমাদের সমাজে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ শব্দটি প্রায়ই অপব্যবহৃত হয়। অন্তত ৯০% প্রগতিশীল শিক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই একটি একমুখী, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা শিশুকে জন্মগতভাবেই একজন ‘কূটনীতিবিদ’ (By-born Diplomat) হিসেবে গড়ে তুলবে এবং উগ্রপন্থা থেকে দূরে রাখবে।

৫. রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব ও শিশুর সুরক্ষা: নাগরিক জাতীয়তাবাদের মানবিক রূপ দেখা যাবে যখন রাষ্ট্র প্রতিটি অনাথ শিশুর দায়িত্ব নেবে এবং শিশুর লালন-পালনে অসমর্থ পরিবারের পাশে দাঁড়াবে। চাইল্ড সাপোর্ট ট্যাক্স এবং রাষ্ট্রীয় জিম্মার বিধান নাগরিককে রাষ্ট্রের প্রতি আরও অনুগত ও দায়বদ্ধ করবে।

আদর্শবাদ বনাম বাস্তবতা

অনেকেই মনে করেন নাগরিক জাতীয়তাবাদ মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ বা সাংস্কৃতিক শেকড়কে অস্বীকার করে। নাদির ভাই যেমন আলোচনা করেছেন, জাতীয়তাবাদ অনেক সময় ‘আমরা বনাম ওরা’ বিভাজন তৈরি করে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে সমাজ আকিদাগত উগ্রতায় ক্ষতবিক্ষত, সেখানে নাগরিক জাতীয়তাবাদ কোনো বিভাজন নয়, বরং একটি ‘সুরক্ষা কবচ’।

ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস বা কসমোপলিটানিজম শুনতে ভালো লাগলেও, একটি নড়বড়ে রাষ্ট্রের জন্য তা ইউটোপিয়া মাত্র। আমাদের আগে নিজের ঘর গোছাতে হবে। একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল নাগরিক পরিচয় না থাকলে আমরা গ্লোবালাইজেশনের ধাক্কায় সস্তা শ্রমিক ছাড়া আর কিছুই হতে পারব না।

উপসংহার

ট্রাম্পের প্রোটেকশনিজম কিংবা AI-এর এই যুগে আমরা যদি নিজেদের ভেতরেই ছোট ছোট পরিচয়ে বিভক্ত থাকি, তবে বৈশ্বিক এই ঝাপটা সামলানো আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। নাগরিক জাতীয়তাবাদ নিখুঁত কোনো মডেল নয়, কিন্তু এটিই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য 'The Least Dangerous Framework'।

এটি আমাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে কেড়ে নেয় না, বরং সেই বিশ্বাসকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি অভিন্ন ঢাল তৈরি করে। সময় এসেছে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি 'মানসিক রেনেসাঁ'র সূচনা করার। নাগরিক জাতীয়তাবাদের এই ১০টি স্তম্ভই হতে পারে সেই আগামীর পথ, যেখানে প্রতিটি বাংলাদেশী গর্বের সাথে বলতে পারবে—রাষ্ট্র আমাদের, আমরা রাষ্ট্রের।

Comments

Popular posts from this blog

টেকনোক্র্যাট আমলাতন্ত্র: আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ইঞ্জিন

শিক্ষা বনাম সামাজিক ন্যায়বিচার: একটি প্রায়োগিক বিশ্লেষণ